ত্বক এবং শরীরের যত্নে লেবুর উপকারিতা (Beauty and Health Benefits of Lemon In Bengali)

ত্বক এবং শরীরের যত্নে লেবুর উপকারিতা (Beauty and Health Benefits of Lemon In Bengali)

ভিটামিন সি, ফাইবার এবং আরও হরেক রকমের ভিটামিন এবং মিনারেল সমৃদ্ধ এই ফলটিকে (Lemon) রোজের ডায়েটে জায়গা করে দিলে একদিকে যেমন হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে, তেমনি ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাও আর থাকে না। সেই সঙ্গে হজম ক্ষমতারও উন্নতি ঘটে চোখে পড়ার মতো। তবে এখানেই শেষ নয়, ডার্মাটোলজিস্টদের মতে ত্বকের পরিচর্যায় যদি এই প্রাকৃতিক উপাদানটিকে কাজে লাগানো যায়, তাহলে স্কিনের ভিতরে এমন কিছু উপাদানের মাত্রা বাড়তে শুরু করে, যার প্রভাবে একাধিক উপকার মিলতে সময় লাগে না (Lemon Water Benefits)।


এত দূর পড়ার পরেও যদি লেবুর উপর ভরসা রাখতে মন না চায়, তাহলে বাকি প্রবন্ধটা পড়ে ফেলতে দেরি করো না যেন! কারণ এমনটা করলে এই ফলটির প্রতি বিশ্বাস যে বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে, তা হলফ করে বলতে পারি।


লেবুর শারীরিক উপকারিতা - Health Benefits Of Lemon In Bengali


নিয়মিত কাঁচা লেবু অথবা লেবুর রস খাওয়া শুরু করলে সাধারণত যে যে শারীরিক উপকার গুলি মেলে, সেগুলি হল...


১. হার্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়:


lemon-1
লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা দৈনিক চাহিদার প্রায় ৫১ শতাংশ পূরণ করতে সম্ভব। এই পরিমাণ ভিটামিন সি শরীরে প্রবেশ করার কারণে হার্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে সময় লাগে না। সেই সঙ্গে লেবুর শরীরে উপস্থিত ফাইবারের কারণে কোনও ধরনের হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও যায় কমে।


সার্কুলেশন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুসারে এদেশে হার্টের রোগের কারণেই সবথেকে বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটছে। শুধু তাই নয়, এই সংখ্যাটা আগামী দিনে যে আরও বাড়বে সে বিষয়ে কোনও আর সন্দেহ নেই চিকিৎসক মহলের। কারণ "গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ" নামক স্টাডিতে দেখা গেছে ভারতে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৭২ জন হার্টের রোগের কারণে মারা যান, যা সারা বিশ্বের মধ্যে সবথেকে বেশি। এবার নিশ্চয় বুঝতে পেরেছো হার্টকে বাঁচাতে এবং কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের মতো মারণ রোগকে দূরে রাখতে লেবু খাওয়া প্রয়োজন কতটা!


২. ওজন নিয়ন্ত্রণে চলে আসে:


অতিরিক্ত ওজনের কারণে কি চিন্তায় রয়েছো? তাহলে রোজের ডায়েটে এই ফলটিকে রাখতে ভুলো না যেন! কারণ নিয়মিত একটা করে কাঁচা লেবু খাওয়া শুরু করলে শরীরে ফাইবারের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যে কারণে বহুক্ষণ পেট ভরা থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কম পরিমাণে খাওয়ার কারণে ওজন কমতে সময় লাগে না। তবে অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে ফেলতে আরেক ভাবেও কাজে লাগানো যেতে পারে লেবুকে। কীভাবে? চিকিৎসকেদের মতে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে এক গ্লাস গরম জলে লেবুর রস মিশিয়ে পান করা শুরু করলে শরীরের ইতিউতি জমে থাকা মেদ ঝরে যেতে একেবারেই সময় লাগে না। আর এই পানীয়তে যদি অল্প করে মধু মিশিয়ে খাওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই! কারণ এমনটা করলে ফল মেলে আরও দ্রুত।


৩. কিডনিতে স্টোন হওয়ার আশঙ্কা কমে:


lemon-3
শরীরে উপস্থিত বর্জ্য পদার্থ যখন ঠিক মতো বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না, তখন তা জমতে জমতে সৃষ্টি হয় স্টোনের। আর এমন স্টোন যদি কিডনিতে হয়, তাহলে কিন্তু বেজায় কষ্ট। আর ঠিক এই কারণেই তো রোজের ডায়েটে লেবুর রসকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কারণ এই পানীয়টিতে উপস্থিত সাইট্রিক অ্যাসিড শরীরে প্রবেশ করা মাত্র প্রস্রাবের হার বেড়ে যায়। আর বারে বারে ইউরিন পাস করার কারণে শরীরের ভিতরে বর্জ্য পদার্থ জমার কোনও আশঙ্কা আর থাকে না। ফলে স্বাভাবিকতভাবেই কিডনিতে স্টোন হওয়ার আশঙ্কাও যায় কমে।


৪. অ্যানিমিয়ার প্রকোপ হ্রাস পায়:


২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্ট অনুসারে ভারতের মোট মহিলা জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশই এমন রোগের শিকার। বিশেষত, কম বয়সি মেয়েদের মধ্যে অ্যানিমিয়ার মতো রোগের প্রকোপ গত কয়েক বছরে চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কাঁচা লেবু বা লেবুর রস খাওয়ার প্রয়োজনও যে বেড়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ একাধিক গবেষণা অনুসারে আয়রনের ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি এই খনিজটি যাতে আরও বেশি মাত্রায় শরীর দ্বারা শোষিত হয়, সে দিকেও নজর রাখে লেবু। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আয়রনের ঘাটতি দূর হওয়ার কারণে লোহিত রক্ত কণিকার উৎপাদন যায় বেড়ে। আর এমনটা হলে অ্যানিমিয়ার মতো রোগ যে আর ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারে না, তা তো বলাই বাহুল্য!


৫. ক্যান্সারের মতো মারণ রোগকে দূরে রাখে:


lemon-5
লেবুতে উপস্থিত বিটা-ক্রিপটোস্কেনথিন (Beta-Cryptoxanthin) এবং হেসপেরেডিন নামক দুটি উপাদান শরীারে প্রবেশ করা মাত্র ক্যান্সার কোষেদের ধ্বংস করতে শুরু করে, সেই সঙ্গে এই ফলটির শরীরে মজুত ভিটামিন সি, টক্সিক উপাদানদের ধ্বংস করে দেয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা একেবারে কমে যায়।


৬. ফুসফুস সংক্রান্ত নানাবিধ রোগের প্রকোপ কমে:


চিকিৎসকেদের মতে প্রতিদিন সকালে উঠে এক গ্লাস লেবু জল খেলে শরীরে এমন কিছু উপাদানের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে শুরু করে, যার প্রভাবে ফুসফুসের ক্ষমতা যেমন বাড়ে, তেমনি অ্যাস্থেমার মতো রোগের প্রকোপ কমতেও সময় লাগে না। তাছাড়া এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স অনুসারে কলকাতা শহরে বায়ু দূষণের মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তো এমন পরিস্থিতিতে ফুসফুসকে সুস্থ এবং রোগমুক্ত রাখতে নিয়মিত লেবুর রস খাওয়ার প্রয়োজন যে বেড়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!


রূপচর্চায় লেবুর রসের উপকারিতা - Beauty Benefits Of Lemon In Bengali


লেবু যে কেবল শরীরকে চাঙ্গা রাখতেই বিশেষ ভূমিকা নেয়, এমন নয়। বরং শরীরের পাশাপাশি ত্বকের যত্নতেও এই প্রাকৃতিক উপাদানটি নানাভাবে সাহায্য করে থাকে, যেমন ধরো...


১. ড্রাই স্কিনের সমস্যা দূরে পালায়:


lemon-7
সারা বছরই কি ত্বক ড্রাই থাকে? তাহলে ১ চামচ লেবুর রসের সঙ্গে হাফ চামচ মধু এবং কয়েক ড্রপ বাদাম তেল মিশিয়ে তৈরি মিশ্রনটি মুখে লাগাতে শুরু করো। এই ফেসপ্যাকটি (Lemon Face Pack) সপ্তাহে ২-৩ দিন মুখে লাগালেই দেখবে হারিয়ে যাওয়া আর্দ্রতা ফিরে আসবে। কারণ লেবুর রস, মধু এবং বাদাম তেল ত্বকের ড্রাইনেস দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সেই সঙ্গে শুষ্ক ত্বকের কারণে যাতে কোনও ধরনের ত্বকের রোগ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখে।


এখন প্রশ্ন হল এতসব উপকার পেতে কীভাবে কাজে লাগাতে হবে এই মিশ্রণটি? এক্ষেত্রে মিশ্রনটি মুখে লাগিয়ে কম করে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। সময় হয়ে গেলে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।


২. অয়েলি স্কিনের সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে:


১-২ চামচ মুলতানি মাটির সঙ্গে ১ চামচ লেবুর রস এবং অল্প পরিমাণে গোলাপ জল মিশিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে নিতে হবে। তারপর সেই মিশ্রনটি সারা মুখে লাগিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। যখন দেখবে ফেসপ্যাকটি ড্রাই হতে শুরু করেছে, তখন ধুয়ে ফলতে হবে। সপ্তাহে একবার এইভাবে ত্বকের যত্ন নিলে সিবামের উৎপাদন কমতে শুরু করবে। সেই সঙ্গে মুলতানি মাটি ত্বকের অতিরিক্ত তেলকে শুষে নেওয়ার কারণে ত্বকের তেলাভাব কমতে সময় লাগবে না।


৩. স্কিন টোনের উন্নতি ঘটবে:


lemon-9


অল্প সময়েই ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাক, এমনটা যারা চাও, তারা ১ চামচ ওটমিলের সঙ্গে হাফ চামচ টমেটোর পেস্ট এবং ১ চামচ লেবুর রস মিশিয়ে একটি পেস্ট বানিয়ে ফেলো। তারপর সেই মিশ্রনটি সারা মুখে লাগিয়ে কম করে ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করো। সময় হয়ে গেলে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা মুখ। সপ্তাহে ২-৩ দিন এইভাবে ত্বকের পরিচর্যা করলে স্কিনের ভিতরে ভিটামিন সি-এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে, যে কারণে মেলানিনের উৎপাদন কমতে শুরু করার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেতে সময় লাগবে না।


৪. ব্রণর প্রকোপ কমবে:


এই ধরনের ত্বকের রোগের প্রকোপ কমাতে এই ফলটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে এমন উপকার পেতে ১ চামচ লেবুর রসের সঙ্গে ১ টা ডিমের কুসুম এবং পরিমাণ মতো গোলাপ জল মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে। তারপর সেই মিশ্রনটি মুখে লাগাতে শুরু করলেই দেখবে কেল্লা ফতে! তবে এই ফেসপ্যাকটি মুখে লাগানোর পর কম করে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। সময় হয়ে গেলে ধুয়ে ফেলতে হবে মুখ। সপ্তাহে মাত্র একবার এই পেস্টটিকে কাজে লাগালেই দেখবে ফল মিলবে একেবারে হাতে-নাতে!


৫. ট্যান কমবে:


lemon-11
গরমকালে বাড়়ির বাইরে বেরনো মাত্রই পুড়ে যায় ত্বক। ফলে স্কিনের সৌন্দর্য কমতে যে সময় লাগে না, তা তো বলাই বাহুল্য! তবে ইচ্ছা হলে নিমেষেই কিন্তু ট্যান দূর করা সম্ভব। কীভাবে? এক্ষেত্রে ২ চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে ৫-৬ ড্রপ লেবুর রস মিশিয়ে সেই মিশ্রনটি মুখে এবং হাতে লাগিয়ে কম করে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। সময় হয়ে গেলে ধুয়ে ফেলতে হবে পেস্টটা। নিয়মিত এইভাবে ত্বকের পরিচর্যা করলে দেখবে কালোভাব একেবারে কমে যাবে। ফলে ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে চোখে পড়ার মতো। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝে গেছো যে সারা গরমকাল জুড়ে এই ফেসপ্যাকটি ব্যবহার করার প্রয়োজন কতটা!


POPxo এখন ৬টা ভাষায়! ইংরেজি, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মারাঠি আর বাংলাতেও!