হালিমের কত গুণ! জেনে নিন এই রমজান-স্পেশ্যাল পদটির ইতিহাস, উপকারিতা ও রেসিপি

হালিমের কত গুণ! জেনে নিন এই রমজান-স্পেশ্যাল পদটির ইতিহাস, উপকারিতা ও রেসিপি

একটি খাঁটি মধ্য প্রাচ্যের ডিশ, সে কিনা পাকেচক্রে হয়ে গেল এই উপমহাদেশীয়! নামটামও পাল্টে গেল! আর এখন তো এমন অবস্থা যে, এই ডিশটি (dish) ছাড়া রমজানই সম্পূর্ণ হয় না। এমনকী, হায়দরাবাদের একটি দোকানে নাকি সারা বছর শুধু এই পদটিই বিক্রি করা হয়! বলছি, হালিম-এর কথা। ডাল-মাংস দিয়ে তৈরি একটি পদ যে এত ভালবেসে ফেলবে এই ভারতীয় উপমহাদেশের বাসিন্দারা, তা বোধ হয় হায়দরাবাদের নিজামরাও (যাঁরা এই দেশে হালিমের জনক) ভাবতে পারেননি!


হালিম নাকি হারিস?


হালিমের (Haleem) ভারতে আগমনের গল্প জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে অনেকটা পথ! এই ডিশটির পূর্বপুরুষ হল, হারিস (Harees)। এই হারিস তৈরি হত পারস্য সম্রাট খুসরোর রাজকীয় হেঁশেলে, ষষ্ঠ শতকে। তার প্রকায় এক শতক পরে, দামাস্কাসের খলিফা ইয়েমেন থেকে আগত এক প্রতিনিধি দলের জন্য প্রথম এই পদটি পরিবেশন করেন! এঁরা অনেক দূর থেকে, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়ে এসেছিলেন, তাই এই ডাল-মাংসের কম্বিনেশনে তাঁদের চটজলদি উদরপূর্তি এবং এনার্জিপূর্তি, দু’টিই হয়েছিল। তারপর থেকেই এটা প্রায় ট্র্যাডিশনের রূপ পায়। যখনই সৈন্যাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরত, তাদের পরিবেশন করা হত এই ইনস্ট্যান্ট এনার্জি বুস্টার ডিশটি! ১৪ শতকে বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবন বতুতার লেখাতেও এই হারিস পরিবেশনের উল্লেখ পাওয়া যায়। মোগল সম্রাট হুমায়ুন যখন শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে পারস্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মোগল হেঁশেলেও স্থানীয় পাচক মারফত জায়গা করে নেয় এই হারিস। তবে হারিসের হালিমে রূপান্তর কিন্তু হায়দরাবাদের নিজামের হাত ধরেই!


ছিল হারিস, হয়ে গেল হালিম!


Haleem 2


ছবি সৌজন্য: ইনস্টাগ্রাম


১৯ শতকে নিজামি (Nizam) রান্নাঘরে হারিস ঢোকে! আসলে এই সময় ইয়েমেনি যোদ্ধার দল চৌশরা নিযুক্ত হয় নিজামের দেহরক্ষী হিসেবে! তাদের একটি গ্রাম দেওয়া হয় বসবাসের জন্য। এই যোদ্ধারা নিজেদের সনাতনী খাবার ও স্থানীয় মালমশলা মিশিয়ে তৈরি করে হারিসের নতুন রূপ হালিম। তখন হালিম হত শুধু গোরুর মাংস দিয়ে এবং নোনতা ও মিষ্টি, দু রকমের হালিমই তৈরি করা হত। চৌশদের কাছ থেকে হালিম আসে নিজামের খানসামাদের কাছে এবং সেখান থেকে নিজামের ব্যক্তিগত ফেভারিট হয়ে ওঠে এই পদটি!


হালিমের উপকারিতা


প্রথমে বলে দিই কী-কী আছে এই পদটিতে। আছে ডাল, গম, মাংস (মূলত বিফ বা মটন, এখন চিকেন হালিমও পাওয়া যায়), নানা রকমের গরম মশলা (দারচিনি, শাজিরে, এলাচ ইত্যাদি), নানা রকমের বাদাম, ঘি, কাজু, কিসমিস, আমন্ড, পেস্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। এত সব ভাল-ভাল উপকরণ যদি থাকে, তা হলে সেই পদ সুস্বাদু তো বটেই, সুখাদ্যও হবে। প্রোটিন, ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাটি অ্যাসিড, ইত্যাদি নানা গুণে সমৃদ্ধ এই খাবারটি খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করলে নাকি সারাদিনের যে পুষ্টিজনিত খামতি, তা অনায়াসে পূরণ করা যায়!


হালিমের প্রকারভেদ


দেখুন, একটা কথা আগে থেকেই বলে রাখা ভাল, ডায়েট হালিম, চিকেন হালিম, ভেজ হালিম ইত্যাদি নামে যে ডিশগুলি আজকাল অলিতে-গলিতে পাওয়া যায়, সেগুলি হল হালিম-নামের অপমান! হালিমের দুটি প্রকারভেদই আছে, সেটি হল বিফ হালিম এবং মটন হালিম! ব্যস!


কোথায়, কবে পাওয়া যায়


এই পদটি মূলত রমজান মাসেই সব মোগলাই খাবারের দোকানে মেলে। দুপুর চারটে থেকে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত আপনি হালিম পেতে পারেন, তারপর সাধারণতই তা শেষ হয়ে যায়! হালিম ঢিমে আঁচে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা ধরে রান্না করাটাই দস্তুর। যাঁদের ইনস্ট্যান্ট খাবারদাবার পছন্দ, তাঁরা এই পদটির মর্ম বুঝতে পারবেন বলে অন্তত আমাদের মনে হয় না! কলকাতায় জাকারিয়া স্ট্রিটে রমজান মাসে পাওয়া যায় নানা ধরনের হালিম। অন্যদিকে বাংলাদেশের ঢাকার মামা হালিম বিখ্যাত!


হায়দরাবাদি হালিম রেসিপি (Hyderabadi Haleem Recipe)


Haleem 1


ছবি সৌজন্য: ইনস্টাগ্রাম


এই পদটি এতটাই দুষ্প্রাপ্য যে, এর রেসিপি প্রায় কোহিনূরের মতো আগলে রাখেন বড়-বড় রেস্তরাঁর মালিক-বাবুর্চিরা! আপনাদের সঙ্গে আমরা শেয়ার করছি খাঁটি হায়দরাবাদি হালিম তৈরির রেসিপি।


উপকরণ: মটন (১ কেজি, ছোট টুকরো করা), ২০০ গ্রাম দালিয়া, ১০০ গ্রাম ছোলার ডাল, ১০০ গ্রাম অড়হর ডাল,  ১০০ গ্রাম মুগ ডাল, ১০০ গ্রাম কলাইয়ের ডাল, ৫০০ গ্রাম পেঁয়াজ (সরু করে কাটা), ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো, ১ চা চামচ শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো, ১ টেবিল চামচ আদা-রসুন বাটা, ধনেপাতা ও পুদিনা পাতা (যথাক্রমে ১ আঁটি ও ১/২ আঁটি, কুচনো), ১ টেবিল চামচ কাঁচালঙ্কা বাটা, ১ চা-চামচ গরম মশলা, তেল ও ঘি সম পরিমাণে (অন্তত ১৫০ গ্রাম করে), এক কাপ দই, ১ চা চামচ শা-জিরা ও গোটা গোলমরিচ, গোটা কাজু, পেস্তা, কিসমিস, আমন্ড (একমুঠো সাজিয়ে দেওয়ার জন্য) নুন আন্দাজমতো।


প্রণালী: সব রকমের ডাল ও দালিয়া ভাল করে ধুয়ে সারা রাত শুকোতে দিয়ে রাখুন। তারপর দালিয়া ও ডাল একসঙ্গে হালকা করে ভেজে নিন। একটি পাত্রে মটন, দই ও নুন দিয়ে অন্তত ঘণ্টাদুয়েক ম্যারিনেট করুন। সারা রাত করে রাখতে পারলে আরও ভাল হয়। তাতে মাংস ভাল করে নরম হবে। ছাঁকা তেলে (তেল-ঘি মিশ্রণে) পেঁয়াজ ভেজে তুলে নিন। তারপর তাতে দালিয়া ও ডাল দিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করুন। এবার ম্যারিনেটেড মটনটা তার মধ্যে দিয়ে নাড়তে থাকুন। মটন রং পাল্টে ফেললে তার মধ্যে একে-একে শা-জিরা, গোলমরিচ, কাঁচালঙ্কাবাটা, আদা-রসুনবাটা, লঙ্কাগুঁড়ো, পেঁয়াজভাজা (অর্ধেকটা) দিয়ে ঢিমে আঁচে মিনিটপনেরো কষিয়ে নিন। আগে থেকে গরম করে রাখা ২ কাপ জল ঢেলে, ঢাকা দিয়ে এই মটন অন্তত ঘণ্টাখানেক কষাতে হবে! এরপর ধনে-পুদিনাপাতা দিয়ে আবার আধঘণ্টা কষিয়ে নিন। তারপর গ্রেভি থেকে মটনের টুকরোগুলি তুলে ফেলুন। গ্রেভিটা একটু ঠান্ডা করে একটি ব্লেন্ডারে ঢেলে ভাল করে মিহি পেস্ট করে নিন। তারপর সেটি আবার কড়াইয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করে, তাতে মটনের টুকরোগুলো দিন, ভাজা পেঁয়াজ, কাজু-কিসমিস-পেস্তা-আমন্ড দিন। মিনিটপাঁচেক রেখে নামিয়ে নিন। উপর থেকে ভাজা পেঁয়াজ ছড়িয়ে পরিবেশন করুন হায়দরাবাদি মটন হালিম!


মূল ছবি সৌজন্য: ইনস্টাগ্রাম


POPxo এখন ৬টা ভাষায়! ইংরেজি, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মারাঠি আর বাংলাতেও! 


আপনি যদি রংচঙে, মিষ্টি জিনিস কিনতে পছন্দ করেন, তা হলে POPxo Shop-এর কালেকশনে ঢুঁ মারুন। এখানে পাবেন মজার-মজার সব কফি মগ, মোবাইল কভার, কুশন, ল্যাপটপ স্লিভ ও আরও অনেক কিছু!