পুজো স্পেশ্যাল অণুগল্প: সপ্তমীর বিকেলের জন্য রহস্যে ভরা গল্প 'মৃত্যু মুখর'

পুজো স্পেশ্যাল অণুগল্প: সপ্তমীর বিকেলের জন্য রহস্যে ভরা গল্প 'মৃত্যু মুখর'

পুজো মানে নতুন জামা, নতুন জুতো, নতুন সাহিত্যও! সাহিত্যাপ্রেমী বাঙালি পুজোর সময় নতুন গল্প-উপন্যাসে চোখে ডুবিয়ে থাকতে সত্যিই পছন্দ করে। আর তাই আমরা আয়োজন করেছিলাম অণুগল্প প্রতিযোগিতার। পাঠকদের কাছ থেকে পুজোর (Durga Puja) জন্য স্পেশ্যাল (special) অণুগল্প (story) চেয়েছিলাম আমরা। বিপুল সাড়া মিলেছে। নানা স্বাদের অণুগল্প জমা পড়েছে আমাদের দফতরে। তার মধ্যে থেকেই বেছে নেওয়া হল কয়েকটি। পুজোর চারদিন সকাল-বিকেল দু'টি করে অণুগল্প আমরা পেশ করব পাঠকদের জন্য।

এই 'মৃত্যু মুখর' গল্পটি লিখেছেন এরিনা দিয়া ঘোষ। 

Pixabay

(১)

জন্মের চোদ্দ বছর পর মা কে দেখেছিলাম আমি। মদ্যপ লম্পট স্বামীর সঙ্গে দু'বছর সংসার করার পর বেরিয়ে আসার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিল আমার মা। ততদিনে আমি এসে গিয়েছি তার জীবনে। বিষাক্ত ভালবাসার ফলস্বরূপ সেই আমাকে অস্বীকার করে বৃহত্তর জীবনের টানে বেরিয়ে পরেছিলেন তিনি। সন্তান প্রতিপালন ও সন্তানের প্রতি দায়বদ্ধতা কেবল মাত্র নারীর হতে পারে বলে মনে করি না আমি। বিশেষত সে সন্তান যখন কারও স্বেচ্ছাচারীতার ফল। তাই তার প্রতি কোন অভিযোগ ছিল না আমার। বুদ্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পেয়েছিলাম বহু লোকজন ভর্তি মহীসূরের রিং রোডের সেই বাড়িতে যেটা আমার মাতামহী উত্তরাধিকার সুত্রে পান। অগণিত ঘর ও লোকজনের মাঝে থাকার দরুণ মা-বাবার অভাব সেভাবে বুঝতেই পারিনি। চোখ মেলার পর থেকেই জ্যানেটকে পেয়েছিলাম পাশে পাশে ছায়ার মতো। আমার অবাধ্য চুলে পনিটেল করা থেকে টেবল ম্যানার্স, সবই শেখায় ওই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এক মাথা সাদা বব চুলের জ্যানেট। রিং রোডের ওই ছায়া-ছায়া পুরোনো আসবাব ঠাসা বাড়িতে গাদাগাদি আত্মীয়দের মাঝেই আমার আর জ্যানেটের একটা আলাদা দুনিয়া গড়ে উঠেছিল। ভীষণ রাশভারী আমার গ্র্যান্ডি কিম্বা হুইলচেয়ারে চেপে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ানো ন্যানির কদাচিৎ চোখ পড়ত মা-বাবা হারা এই আমার উপর।

(২)

এসি হামিদি। ১৯ বছরের উদ্ভিন্ন যৌবনা পার্সি যুবতী, তার ছোট বেলার পরিচারিকা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বৃদ্ধা মিস জ্যানেটের খুনের দায় স্বীকার করে আজ তিনদিন উটকামন্ড পুলিশ কাষ্টাডিতে। লেডি অফিসার দের ক্রমাগত প্রশ্নের একটাও জবাবদিহি করেনি।তার অদ্ভুত গাম্ভীর্য ,নিরুত্তাপ গভীর সামুদ্রিক চাহনি আর ভাবলেশহীনতার অসহ্য আতিশয্যে সুপার, কমিশনার সকলেই বিব্রত। এসির মাতামহ মহীসূরের নগোরন্নায়নের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। মেয়েটির মা সায়রা আহমাদি বিশিষ্ট সমাজসেবী। বি পিতা আজুরা আহমাদি নীলগিরি ডিস্টির্ক্ট হেডকমান্ড এর সাব ম্যাজিস্ট্রেট। এইরকম পারিবারিক পরিচয় থাকা সত্বেও ৬৫ বছরের বৃদ্ধা পরিচারিকাকে তার কোয়ার্টার সংলগ্ন স্টোর রুমে ধারালো কোন অস্ত্রে, সম্ভবত ড্যাগার বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে ১১ বার কুপিয়ে মারা হয় ও আশ্চর্যজনক ভাবে তার চোখটি উপড়ে ফেলা হয়! এবং খুনের পাঁচ ঘণ্টা পর এসি পুলিশের কাছে এসে স্বীকারোক্তি দেয়। কিন্তু মার্ডার ওয়েপন পাওয়া যায় নি। মেয়েটিও সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। 

 (৩)

অ্যাসিস্টান্ট কমিশনার মিঃ ধীরজ রাঠোর নিজেই এই কেসটার তদন্তের দায়িত্ব নেন। কেস অফ ক্লিয়ার হোমিসাইড,অথচ মার্ডার উইপন মিসিং। খুনী নিজেই স্বীকারোক্তি দেয়। কিন্তু তারপর থেকে আর কোন সহযোগিতা করছে না। খুনীর পারিবারিক অবস্থান ভাল এবং সেই দিক থেকে তার নির্দোষ প্রমাণের জন্য বিশিষ্ট অ্যাডভোকেটও নিযুক্ত হয়েছে। যদিও মেয়েটি তাকেও সহযোগিতা করছে না। এরকম অনেকগুলো সূত্র হাতে এলেও গোলকধাঁধাটা রয়েই যাচ্ছে। সবচেয়ে সন্দেহজনক হল গত দেড় বছরে উটকামন্ড ও মহীসূরে আরও কয়েকটা আনসলভ্ড হোমিসাইডের কেস এ খুনের পর শরীরের কোন অংশ উপড়ে নেওয়া হয়। তদন্তে (investigation) নেমে ধীরজ প্রথমেই এসির বাড়ি যান। বর্তমানে মেয়েটি তার বি পিতা ও মায়ের সঙ্গে উটকামন্ড এর চেরিং ক্রস রোডে মিঃ আহমাদির সরকারি বাংলোয় থাকত। ব্যক্তিগত কিছু জিনিসের সঙ্গে একটা ধূসর চামড়ার ডায়েরিও পান তিনি। বছরপাঁচেক আগে থেকে খাপছাড়া ভাবে তাতে লিখতে শুরু করে এসি। 

(৪)                   

বেশ উঁচু ওই দাখ্মাতে উঠে ভীষণ রকম গা গুলিয়ে উঠেছিল আমার। জ্যানেট যদিও বারবার মানা করেছিল এখানে আসতে। বড় অদ্ভুত ছেলে সাহিন। ন্যানির বড় বোনের আত্মীয়। মেডিকেল ফাইনাল দেবে অথচ ছেলেমানুষি এখনও পিছু ছাড়েনি। রিং রোড ছাড়িয়ে শহরের শেষ প্রান্তে বন্দিপুর ঘেঁষা এই জঙ্গুলে প্রান্তে আমাদের দাখ্মা আছে জানতাম। প্রভু জরাথ্রুষ্ঠের উপাসক পার্সি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এই নশ্বর দেহ ছেড়ে আত্মা চলে গেলেও তা নষ্ট না করে শবভূক পাখি, কীটপতঙ্গের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার্য। আর তাই শহরের প্রান্তে তৈরি বর্তুলাকার এই স্তম্ভে আত্মীয়রা মৃতদেহকে উৎসর্গ করে। একদম বাইরের দিকে পুরুষদের দেহ মাঝে মহিলা ও ভিতরের সারিতে শিশুর মৃতদেহ থাকে। মাঝ দুপুরের উজ্জ্বল আলোয় বিকৃত গলিত ম্যাগট আক্রান্ত মাছি ওড়া কয়েকটা শবদেহ, তা থেকে গলা, পচা রক্ত-মাংস জড় হওয়া মাঝের গর্ত সব মিলে সেদিন আমায় এক বিভীষিকায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আর তখনই সাহিন বলেছিল, ওর হাসপাতালের চিকিৎসাধীন আমার বাবা দারিয়ূস হামিদির মরদেহ ও দু'-একদিনের মধ্যে দাখ্মায় আনা হবে। এক লহমায় দুলে উঠেছিল আমার গোটা পৃথিবী।

 (৫)

টাওয়ার অফ সাইলেন্স, পার্সিরা বলেন দাখ্মা, বন্দিপুর ঘেঁষা এই অঞ্চল এমনিতেই বেশ ফাঁকা। দাখ্মার গোলাকার স্তম্ভের নীচতলায় অন্ধকার অফিস ঘর। কোমর পড়ে যাওয়া অশীতিপর বৃদ্ধ রেজিস্টারকে মৃতদেহ দাখিলের তারিখ বলায় মোটা চশমার কাঁচের ভিতর দিয়ে অনেক কষ্টে খুঁজে পেল তার বিবরণ। ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হার্টফেল। বয়স ৪৫। আরেকটা চমক্প্রদ তথ্য ও হাতে এল মিঃ রাঠোরের। মৃতদেহের বেশ কয়েকটি অঙ্গ মিসিং ছিল। কিন্তু কেন? সদুত্তর দিতে পারল না বৃদ্ধ রেজিস্টার। এবার গন্তব্য সিটি মেডিকেল কলেজ। ওখানেই মৃত্যু হয়েছিল দারিয়ূস হামিদির। এসির বাবা।সিটি মেডিকেলের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেহদানের পর তার শরীর থেকে দু'টি কিডনি, দু'টি চোখ ও নাসিকা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। আর আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিস্থাপনের প্রতিটা ফর্মেই সই করেছেন সমাজসেবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সায়রা আহমাদি। দারিয়ূস এর প্রথমা স্ত্রী। 

(৬)

সেদিন আমাদের স্কুল এক্সকারশন ছিল সেন্ট ফিলোমিনায়। সপ্তদশ শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক চার্চটি বিখ্যাত তার গথিক স্থাপত্যের জন্য। অনেক ছবির শুটিংও হয়েছে এখানে। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম অদ্ভুত করূকাজ করা আর্চগুলো। এমন সময় চোখ পড়ল লোকটার উপর। কেমন মনখারাপ করা দৃষ্টিতে দেখছিল আমায়। তারপর থেকে প্রায়ই দেখি তাকে। লোকটা ছায়ার মতো অনুসরণ করছে আমায়। জ্যানেটকে লোকটার কথা বলতেই আঁতকে উঠল। অনেক অনুরোধের পর জানাল লোকটাই আমার পিতা। দারিয়ূস হামিদি। মার্চেন্ট নেভির ক্যাপ্টেন ২৫ বছরের যুবকটির বৈশিষ্ট্য ছিল পিয়ানোয় ঝড় তোলা। আর তাতেই ভুলেছিল আমার তরুণী মা। ভুল ভাঙে বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই। কিন্তু কই একবারও তো তাকে দেখে মনে হল না, প্রবঞ্চক জীবনকে নেহাতই হাতের তালুতে নিয়ে ফুঁ দেওয়া কোনও মানুষ। বরং অদ্ভুত এক টান অনুভব করলাম আমি। একেই কি বলে রক্তের টান?

(৭)

সিটি মেডিকেল কলেজের রেজিস্টারে থাকা নাম ও বিবরণী অনুযায়ী দারিয়ূসের অঙ্গগ্রহীতাদের পরিচয় জেনে ভীষণ ভাবে চমকে উঠল একনিষ্ঠ পুলিশ অফিসার ধীরজ রাঠোর। দারিয়ূসের কিডনি দুটি প্রতিস্থাপিত হয় মহীসূর আর পি এফ কলোনির ৬২ বছরের মিঃ বাসুদেব রাও ও কলেজ রো র রিটায়ার্ড লাইব্রেরিয়ান রাজলক্ষ্মী আইয়ারের দেহে। নাসিকা প্রতিস্থাপন হয় ন্যাশানাল হাইয়ের সেকেন্ডারির ছাত্র এস বালাজির দেহে ও চোখ দুটি পায় উটকামন্ড এর ৬ বছরের পদ্মজা রাউত ও মহীশূর এর রিং রোডের ৬৫ বছর বয়সি মিস জ্যানেট। যার খুনের দায় স্বীকার করে অভিযুক্ত এসি হামিদি এখন পুলিশি হেফাজতে।  

(৮)

নীল নীল আলোর একটা বল ঘুরে চলেছে লাউড মিউজিকের তালে তালে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলে মেয়েরা উদ্দাম নাচছে। সঙ্গে চলেছে দেদার পানীয়ের ফোয়ারা। আমার কোমর জড়িয়ে সাহিন নাচছে। রক্ত লাল ছোট পোশাকটায় বেশ উত্তেজক দেখায় আমাকে। গাঢ় মাশকারা ,কাঁধ ছোঁয়া মসৃণ চুলে তুমুল আহ্বান। মহীশুরের এই ডিস্কোয় সাহিনই আমায় এনেছিল দিন দশ আগে। দারিয়ূস হামিদি চালান এই ডিস্ক বার। এখনও পিয়ানোয় ঝড় তুলে কাঁপিয়ে দেন ফ্লোর। কেমন নেশা ধরান সেই সুর আমাকেও আচ্ছন্ন করে দিল। থেমে গেছে পিয়ানো। ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকেই মিঃ হামিদি, আমার ব্লাড ফাদার। জড়ানো গলায় বলে উঠলাম, সায়রা আহমিদির বর্তমান স্বামী আমায় লিগ্যালি অ্যাডপ্ট করছেন আমার আগামী জন্মদিনে। মুহূর্তে আমার বাবার মুখ ফ্যাকাশে। কাতরতা ফুটে উঠছে চোখে মুখে। জানতে চাইলেন আমি খুশি কিনা? কী বলব আমি? আমার খুশির খবর কেউ জানতেই চায়নি কোনওদিন। নিজের খারাপলাগা ভাল লাগা নিয়ে খেলতে খেলতে কবেই ভুলে গিয়েছি আসল খুশির ঠিকানা।

(৯)

আর পি এফ কলোনি থেকে রেলস্টেশন ১০ মিনিটের পথ। সেদিন রাত ৯টার ট্রেন ধরে বেঙ্গালুরুতে ভাইপোর কাছে যাওয়ার কথা ছিল বাসুদেব রাওয়ের। পারিবারিক জমিজমার কয়েকটা কাগজপত্রে সই করার ছিল। জনবহুল মহীসূর রেলস্টেশনের গুমটি ঘরের পাশেই তার মৃতদেহটি দেখতে পায় এক কুলি। রাত ১১টা নাগাদ। রক্তে ভেসে যাওয়া পেট থেকে কিডনি উপড়ে নেওয়া। বিপত্নীক মিঃ রাওয়ের ভাইপোকেই সন্দেহ করে পুলিশ। কিন্তু খুনের রাতে বেঙ্গালুরুতে থাকার জোরাল অ্যালিবাই থাকায় গ্রেপ্তার হয় না সে। দিন দশ পরের পরের এক সপ্তাহান্তে ন্যাশনাল হাইয়ের বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন এস বালাজি স্কুলের পর সাঁতার কাটতে যায় বাড়ির কাছেই এক পুলে। মাসতিনেক আগেই লসিকা প্রতিস্থাপন হয়েছিল তার। পুলের ঠিক মাঝামাঝি সাঁতরেই ডুবে যায় সে। খুব অদ্ভুত ভাবেই মৃতদেহ পাওয়া যায়নি পুলে। দিনতিনেক বাদে রক্তশূন্য দেহটি মেলে বান্দিপুর এর জঙ্গলে। ছোট-বড় শ্বাপদ সঙ্কুল জঙ্গলে একেবারে অক্ষত মৃতদেহ। সেন্ট্রাল পার্ক বাড়ির কাছেই। প্রতিদিন ভোরে আধঘণ্টা হাঁটতেন রাজলক্ষ্মী আইয়ার। সেদিন দু' ঘণ্টা পরও ফিরছেন না দেখে কাজের মেয়েটি পার্কে আসে। লোকজনের জটলার মাঝে আবিষ্কার করে মালকিনের পেট কাটা মৃতদেহ। ছটফটে বছর ছয়ের মেয়েটা লেক পাইকারায় পিকনিক করতে গেছিল। হঠাৎই হারিয়ে যায় সে। আজ ও মিসিং কেসের ফাইল এর পাতায় হাসিমুখে তাকিয়ে আছে সে। সাতচল্লিশ বছরের দুঁদে পুলিশ অফিসার ধীরজ রাঠোর বহু কঠিন সমস্যা সমাধান করা মস্তিস্কের ধূসর পদার্থে টান অনুভব করলেন। এসব মৃত্যুর জন্য কি ঐ মেয়েটাই দায়ী? সবক'টা কেসের সুরতহাল রিপোর্ট চেয়ে পাঠালেন তিনি। 

(১০)

“ইলেকট্রা কমপ্লেক্স” এ রাতদিন কেমন নেশা ধরানো হয়ে গিয়েছে আজকাল। ভীষণ ভাবে কাছে পেতে ইচ্ছে করে তাকে। আজুরা আহমিদি। মেঘ জমনো আওয়াজে তিনি যখন ডাকেন মাকে, অথবা আমায়, কিছু একটা কাঁপিয়ে দেয় অস্তিত্বকে। আর ঠিক তখনই বিজাতীয় অনুভুতি হয় সায়রা আহমাদির উপর। কী দারুণ চাতুর্যে আমার পিতাকে ছেড়ে অসহায়তার নিপুণ জালে আটকেছেন আজুরাকে। আজকাল যাকে কাছে পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমিও কাটাই তার সঙ্গে, উটকামন্ডের বাগানের পরিচর্যায়। গাছপালা ও বাগানচর্চা, নয় আজুরার কাছে থাকার মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে। যেদিন দারিয়ূস জানাল সায়রা আহমিদির অজানা কথাগুলো, সেদিনের পর থেকেই আরও চাইছি আজুরার কাছাকাছি যেতে। সর্বোতভাবেই দারিয়ূসকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতেই আমাকেও সরিয়ে এনেছিল আমার মা। বিদূষী সুন্দরী সায়রা আহমিদি। ‘মা’ শব্দটাও যাঁর জন্য বিষাক্ত লাগে! 

(১১)

শ্বাসক্রিয়া রূদ্ধ হয়ে মৃত্যু। তিনটে মৃত্যূর কারণই মিলে গেল হুবহু। মিসিং বাচ্চাটির কথা বাদ দিলেও মিস জ্যানেটের মৃত্যুটা সব হিসেব এলোমেলো করে দিচ্ছে এসিকে বাকি খুনগুলোর জন্য দায়ী ভাবতে। মিঃ আজুরা আহমিদি এসেছেন। মিঃ রাঠোরই ডেকেছেন তাকে তদন্তের কিছু সুত্র মেলানোর জন্য। হাইওয়ের ধারে থাকায় দারিয়ূসের বার কাম ডিস্কের বন্ধের নোটিস দিয়েছিল সরকার। আর সেটি বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব পরেছিল সায়রার এন জি ও-র উপর। তাও মৃত্যু পরবর্তী দেহদানের ফর্মে সায়রাকেই ও সম্মতির দায়ভার দিয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত চরিত্র তো দারিয়ূস হামিদির!  

(১২)

কনিয়াম মাকুলাটাম বা বিষাক্ত হেমলক, সাদা থোকা থোকা ফুলে ভর্তি ঝোপাল গাছটার ফুল তুলতে যাচ্ছিলাম। আচমকা টেনে সরিয়ে নিল আজুরা। আনমনা কখন যেন বাগানে চলে এসেছিলাম। ডিস্কটা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পরেছিল দারিয়ূস হামিদি। গতকালই সিটি হসপিটালে ভর্তি হন তিনি। আমায় ডেকেছেন শুনেই সাহিনের সঙ্গে গিয়েছিলাম। আমায় বুকে জড়িয়ে ক্ষমা চাইলেন দু' চোখ ভর্তি জল নিয়ে। টাওয়ার অফ সাইলেন্সে তার অক্ষত দেহ স্থাপনের শেষ ইচ্ছা জানালেন আমায়। কথা দিলাম। কখনও কখনও ছোটদেরও ক্ষমার উঁচু চৌকাঠ পার করতে হয়। বড় বিষাক্ত এই গাছের পাতা, ফুল। কয়েকটি তরল কোন পানীয়ের সঙ্গে শরীরে ঢুকলেই নির্ঘাৎ মৃত্যু। কেন যে আজুরা জানাল এই কথা ?

(১৩)

আবছায়া অন্ধকার কোণ থেকে এগিয়ে এসেছিল মেয়েটা। চোখে দেখতে পায় না। হাতে ব্লাইন্ডস্টিক। মায়া হল বৃদ্ধ বাসুদেব রাওয়ের। উটকামান্ড এর বিখ্যাত হোম মেড চকোলেট নিয়ে বিক্রি করছে। টেষ্ট স্যাম্পেলও দিল একটু। তারপর আর কিছুই বোঝেনি সে। ভীষণ রকম বুক ধরফর আর চোখে ঝাপসা দেখছিল। সেই প্রথম এত রক্ত একসঙ্গে দেখেছিল এসি। বিষাক্ত কনিয়াম মাকুলাটামের প্রতিক্রিয়ায় ততক্ষণে স্নায়ুপেশির সংযোগস্থলে রক্ত জমাট বেঁধে শ্বাসরূদ্ধ করে তুলেছে লোকটাকে। একই ভাবে বাকি দুজনকেও শেষ করেছিল। পায়ে দড়ি বেঁধে বালাজির দেহ টেনে নিয়ে গেছিল জঙ্গলে। সাহিনের থেকে না বলে নেওয়া সিরিজের টানে বের করেছিল রক্ত মিশ্রিত লসিকা। হেমলকের বিষে মরা দেহে দাঁত ফোটাতে বনের জন্তুরাও ভয় পেয়েছিল। 

একটু অসুবিধা হয়েছিল বাচ্চাটাকে নিয়েই। চোখ উপড়ানোর পর দেহটাকে দিনের আলোয় লুকোনো সম্ভব হচ্ছিল না। লেক পাইকারার জলেই ভাসিয়ে দেয় শেষে। কিন্তু সব হিসেব গুলিয়ে গেল জ্যানেটের রেটিনা প্রতিস্থাপনের পর। সায়রা আহমিদির ইচ্ছেকে একদম সফল হতে দেবে না ও। দারিয়ূসের শেষ ইচ্ছেকে সম্মান জানাতে হারাতেই হবে ওই মহিলাকে। বাবার সব অঙ্গকে পৌঁছে দিতেই হবে দোখমায়। উপড়ে নেওয়া চোখের সঙ্গে ছোরাটাও ফেলে দিল দোখমার মাঝের গর্তে। পচা গলা রক্ত মাংস আর লার্ভা ম্যাগটে এতদিনে ঢেকে ফেলেছে ওটা।                             

(১৪)

বড় চতুর চাল চেলেছিল স্বার্থপর হিংস্র দারিয়ূস। সায়রার উপর নেওয়া চরম প্রতিশোধ। বাঁচবে না জেনেই সায়রাকে অঙ্গদানপত্রের সাক্ষী করে দেয়। আর মায়ের মতই বোকা মেয়েটাকে সফলভাবে ভুল বোঝায়। খুনের দায়ে মেয়ের জেল হলে সায়রার সামাজিক অবস্থান যে হেয় হবে, তা অনুমান করেই শান্তির শেষ নিশ্বাস ফেলেছিল দারিয়ূস। আর তাতে ঘি ঢেলেছিল আজুরার কঠিন প্রত্যাখ্যান। নেহাতই বোকা মেয়েটা স্নেহ আর প্রেমের পার্থক্য বুঝতে পারেনি।    

(১৫)

এখানে ঘুম আসে না এসির। ঘটনার আচম্বিকতায় হতভম্ব ও। মার্ডার ওয়েপন খুঁজে পায়নি পুলিশ (police)। ন্যানির অ্যাডভোকেট হয়তো ওকে মানসিক রোগী প্রতিপন্ন করবে। তাতে ফাঁসিটা আটকালেও জেলেই কাটবে আজীবন। একটা দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে। ঘুলঘুলি দিয়ে বিদায়ী সূর্যের আলো এসে পরেছে ওর পায়ে। যে পায়ে টলমল করে হাঁটবে ভবিষ্যতের কত শিশু। শক্ত মুঠোয় জন্মদাতার হাত ধরে। তারা নিশ্চই দারিয়ূসের (Daniyush) মতো হবে না।

 

POPxo এখন ৬টা ভাষায়! ইংরেজি, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মারাঠি আর বাংলাতেও!

এসে গেল #POPxoEverydayBeauty - POPxo Shop-এর স্কিন, বাথ, বডি এবং হেয়ার প্রোডাক্টস নিয়ে, যা ব্যবহার করা ১০০% সহজ, ব্যবহার করতে মজাও লাগবে আবার উপকারও পাবেন! এই নতুন লঞ্চ সেলিব্রেট করতে প্রি অর্ডারের উপর এখন পাবেন ২৫% ছাড়ও। সুতরাং দেরি না করে শিগগিরই ক্লিক করুন POPxo.com/beautyshop-এ এবার আপনার রোজকার বিউটি রুটিন POP আপ করুন এক ধাক্কায়...