শীতকালে গুড় খাওয়ার উপকারিতা এবং ত্বক ও চুলের যত্নে গুড়ের ভূমিকা

শীতকালে গুড় খাওয়ার উপকারিতা এবং ত্বক ও চুলের যত্নে গুড়ের ভূমিকা

সুকুমার রায় যথার্থ কথা বলে গেছেন একশ বছর আগে। “কিন্তু সবার চাইতে ভাল/ পাউরুটি আর ঝোলা গুড়!” অর্থাৎ এই পৃথিবীতে সব ভাল ছাপিয়ে গুড়ের মাহাত্ম্য স্বীকার করে গেছেন তিনি। আর এই কথা যে নেহাত মিথ্যে নয় সেটা আপামর বাঙালি জানে। তাই তো শীতকাল এলেই গুড় আর গুড় করে এত হ্যাংলামি। তবে হাসি ঠাট্টা একদিকে সরিয়ে রেখেই বলা যায়, গুড় শুধু আমাদের স্বাদ কোরকের মনোরঞ্জনই করে না। শরীর স্বাস্থ্যেরও (health) অনেক উন্নতি ঘটায়। তাছাড়া ত্বক (beauty) ও চুলের যত্নেও এর ভূমিকা কম নয়। বিশ্বাস না হলেও এটাই সত্যি। আমাদের মা ঠাকুমারা শিখিয়েছেন যে সময়ে যা ওঠে, সেটা সেই সময়েই প্রাণ ভরে খেয়ে নিলে রোগ বালাই দূরে থাকে। সে ফল হোক, সব্জি হোক বা গুড়। তাই নিজের অজান্তেই আপনি নিজের যা উপকার করেছেন আপনি জানেন না। আজ সেই বিষয়েই কিছু কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করে নেব। বলব শীতকালে গুড় (jaggery) খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে।

Table of Contents

    গুড় আসলে কী?

    আখের রস থেকেই হয় গুড়

    অপরিশোধিত চিনিকেই গুড় বলা হয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে গুড় উৎপাদন হয়। তবে ৭০% গুড় উৎপাদন হয় ভারতে। মূলত আখের রস থেকেই এই গুড় তৈরি হয়। তবে যখন তাল হয় তখন সেই দিয়েও গুড় হয়। গুড়ের পাটালি অর্থাৎ শক্তরূপে এবং পাতলা অবস্থাতেও এই গুড় বিক্রি হয়। উৎকৃষ্ট মানের গুড়ে ৭০% সুক্রোজ থাকে। এছাড়াও থাকে খনিজ এবং গ্লুকোজ।

    শীতকালে গুড় কেন খাব?

    শীতকালে শরীর উষ্ণ রাখে গুড়

    এমনিতে গুড় সারা বছরই খাওয়া যায়। তবে শীতকালে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। পুষ্টিবিদরা বলেন চিনি তৈরির সময় আখের রসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। যেগুলো কিন্তু গুড় তৈরির সময় রেখে দেওয়া হয়। এই উপাদানগুলো যেমন ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। এগুলো শরীরকে উষ্ণ রাখে। তাছাড়া শীতকালে দূষণ একটু হলেও বেশি থাকে। গুড় খেলে দূষণ জনিত রোগ প্রতিরোধ করা যায়। তাই শীতকালে গুড় খাওয়া উচিত।   

     

    স্বাস্থ্যরক্ষায় গুড়ের উপকারিতা

    গুড়ে অনেক উপকারি উপাদানা ছে যা চিনিতে নেই

    সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে চিনির থেকে গুড়ের চাহিদা বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন চিনি খেলে শরীরের অনেক ক্ষতি হয় কিন্তু গুড়ে সেটা হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। সেটা কতদুর সত্যি আমাদের জানা নেই। তবে একথা ঠিক যে গুড় খেলে শরীরের ভাল হয়। তাই স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনে গুড় কীরকম ভূমিকা নেয় সেটা জেনে নেওয়া দরকার।

     

    ১)হজম ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে

    হজম ক্ষমতা বাড়ায় গুড়

    অনেকেই খাওয়া দাওয়ার শেষে এক টুকরো পাটালি খান বা অল্প একটু গুড় খান। গুড় পেট পরিষ্কার রাখে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন। যদিও গুড়ে একটুও জল বা ফাইবার থাকে না। এই দুটো না থাকলে পেট পরিষ্কার হওয়ার কথা নয়। তবে গুড় আমাদের শরীর থেকে নিঃসৃত এনজাইমগুলোকে আরও সক্রিয় করে তোলে। সেক্ষেত্রে পেটের সমস্যা দূর হয়।

     

    ২)লিভার পরিষ্কার রাখে

    এটি আমাদের শরীরে ডিটক্স হিসেবে কাজ করে। কারণ যা যা বিষাক্ত জিনিস আমাদের শরীরে জমা হয় বা লিভারে জমা হয় সেগুলো সব বের করে দেয়।তাই প্রতিদিন গুড় খেলে শরীর থেকে সব বিষ বের হয়ে যায়।  

    ৩)সংক্রমণ প্রতিরোধ করে

    গুড়ে আছে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আর খনিজ যেমন জিঙ্ক ও সেলানিয়াম ইত্যাদি। এরা শরীর থেকে বিষাক্ত র‍্যাডিকালস দূর করে। এই র‍্যাডিকালস অকালে বুড়িয়ে যাওয়া আরও ত্বরান্বিত করে। তাছাড়া নানা রকমের সংক্রমণ দূরে রাখতে এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে গুড়।

    ৪)মেয়েলি সমস্যার সমাধান করে

    ঋতুস্রাবের সময় পেট ব্যাথায় কাজ দেয়

    গবেষণায় দেখা গেছে মহিলাদের পিএমএস সংক্রান্ত নানা সমস্যা দূর করতে সক্ষম। বিশেষ করে যাঁদের এই সময়ে খুব বেশি মুড সুইং হয় বা ঋতুস্রাবের সময় পেট ও কোমরে ব্যাথা করে তাঁদের রোজ অল্প করে গুড় খাওয়া দরকার। রোজ না হলেও অন্তত যে সময় ঋতুস্রাব হচ্ছে সেই সময় খেতে পারেন।

    ৫)এনার্জির যোগান দেয়

    এটি একটি হাই ক্যালোরি খাবার। সামান্য পরিমাণ গুড় খেলেই শরীর অনেক বেশি এনার্জি পায়। তাই ক্লান্তি কাটাতে বা সারাদিনের ধকল সামলাতে হলে একটু গুড় খেলেই হবে। ক্যালোরি বেশি বলে অনেকেই এটা খেতে ভয় পান। তবে সামান্য খেলে কিছু হবে না।

     

    ৬)শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যা দূর করে

    প্রতিদিন অল্প করে গুড় খেলে শ্বাসকষ্টজনিত যে সব সমস্যা আছে যেমন অ্যাজমা বা ব্রঙ্কাইটিস এগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। দূষণের কণা শোষণ করে নেওয়ার ক্ষমতা গুড়ের আছে। তিল আর গুড় একসঙ্গে মিশিয়ে খেলে অনেক বেশি কার্যকরী হয়।

     

    ৭)ওজন কমায়

    ওজন রাখে নিয়ন্ত্রণে

    গুড়ের মধ্যে আছে পটাশিয়াম। এই উপাদান শরীরে পেশী গঠনে এবং হজম ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। পটাশিয়াম শরীরের বাড়তি জলের ভারসাম্যও বজায় রাখে। পুষ্টিবিদরা বলছেন গুড় ডায়েটে থাকলে এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে।

     

    ৮)হাড়ের ব্যাথা

    গুড় হাড় শক্ত করে, বলছেন হাড়ের ডাক্তাররা। তাঁরা পরামর্শ দিচ্ছেন এক কুচি আদা আর গুড় রোজ সকালে খেতে যাঁদের হাড়ের সমস্যা আছে তাঁদের। তাছাড়া দুধের মধ্যে গুড় দিয়েও খাওয়া যায়।

     

    ৯)রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে

    গুড়ের মধ্যে আছে পটাশিয়াম আর সোডিয়াম। শরীরের সাম্য বজায় রাখতে এই উপাদানের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এই দুটি উপাদানের মাধ্যমেই গুড় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।  

     

    ১০)পেটের সমস্যা দূর করে

    পেট ঠান্ডা রাখতে গুড়ের জুড়ি নেই। অনেকেই এইজন্য গুড়ের শরবত পান করেন। শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রেখেই গুড় পেট ঠান্ডা রাখে। বেশি খাওয়া দাওয়া হলে এক টুকরো গুড় আর জল খেলেও কাজে দেয়।

     

     

    রূপচর্চায় গুড়ের ভূমিকা

    রূপচর্চাতেও কাজে দেয় গুড়

    আপনি শুনলে অবাক হবেন কিন্তু এটাই সত্যি। শুধু স্বাস্থ্যরক্ষা নয় রূপচর্চাতেও দিব্যি কাজে আসে গুড়। আসলে এর মধ্যে এত গুণ আছে যে চুল আর ত্বকের যত্নেও কাজে দেয়। এবার দেরি না করে দেখা যাক, কোন কোন কাজে লাগে গুড়।

     

    ১) ব্রণ বা পিম্পল দূর করে

    ত্বকে আনে ঔজ্জ্বল্য

    গুড় ব্রণ আর অ্যাকনে দূর করে। দেখা গেছে রোজ এক টুকরো করে গুড় খেলে ত্বক উজ্বল হয়, দাগছোপ দূর হয়। আর ত্বকের সমস্যাও অনেক কমে যায়।

    ২) বলিরেখা দূর করে

    প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এর উল্লেখ আছে। দেখা গেছে তিলের তেল, জড়িবুটি আর গুড় মিশিয়ে লাগানো হচ্ছে বয়স ধরে রাখার জন্য। অর্থাৎ গুড়ের মধ্যে অ্যান্টি এজিং উপাদান আছে।

    ৩) ত্বক নরম রাখে

    গুড়ে গ্লাইকোলিক অ্যাসিড আছে যা ত্বক নরম রাখতে সাহায্য করে। গুড়ের সাথে একটু মধু আর লেবুর রস মিশিয়ে মুখে মাখুন। কিছুদিন পর নিজেই বুঝতে পারবেন আপনার ত্বকের জেল্লা।

    ৪) দাগছোপ দূর করে

    গুড়ের সঙ্গে একটু লেবুর রস, একটু টমেটোর রস আর একটু হলুদ মিশিয়ে মাখলে মুখের দাগছোপ দূর হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে ট্যানও দূর হয়।

    ৫) ত্বকে পুষ্টি যোগায়

    আগেই বলেছি গুড়ে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, খনিজ আর ভিটামিন যেগুলো ত্বকের জন্য খুব উপযোগী। তাই গুড় খেলে বা মাখলে ত্বকের পুষ্টি হয়।

    ৬) চুল নরম করে

    চুল নরম করে গুড়

    গুড় চুল নরম করে। কারণ এর মধ্যে আছে ভিটামিন সি। গুড়ের সঙ্গে মুলতানি মাটি আর দই মিশিয়ে মাখলে চুল হবে দারুণ সুন্দর আর নরম। একবার ট্রাই করে দেখতে পারেন।

    ৭) চুলের গোড়া মজবুত করে

    চুলের গোড়া মজবুত করে গুড়। তার জন্য সব সময় যে আপনাকে গুড় মাখতে হবে তার কোনও মানে নেই। নিজের ডায়েটে গুড় রাখলেই আপনি এর প্রভাব বুঝতে পারবেন।

     

    ৮) চুল পড়া নিয়ন্ত্রণ করে

    এই কথা যদিও বলা যাবে না যে গুড় চুল পড়া বন্ধ করে। তবে এইটুকু বলা যায় যে এর মধ্যে যা যা উপাদান আছে সেগুলো চুল পড়া কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ আগের চেয়ে চুল পড়ার সংখ্যা অনেক কম হয়।

     

    ৯) খুসকি কম হয়

    কিছুটা হলেও খুসকি কম করে গুড়

    যেহেতু এতে ভিটামিন সি আছে তাই কিছুটা হলেও গুড় খুসকি কম করে। তবে এই কথা এখনও বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত হয়নি। যদিও অনেকে দাবী করেছেন গুড়ের শরবত খাওয়ার পর তাঁরা খুসকি থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেয়েছেন।

     

    গুড়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

    গুড়ের সেই অর্থে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। অর্থাৎ এটি খেলে আপনার অ্যালার্জি হবে বা সেইরকম কিছু নয়।এর খারাপ প্রভাব অন্যভাবে পড়ে। গুড় আসলে চিনিরই একটি অন্যরূপ। তাই গুড় খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার প্রভুত আশঙ্কা থাকে। তাছাড়া এটি একটি হাই ক্যালোরি খাবার বা মিষ্টি যা রোজ গ্রহণ করলে ওজন বাড়তে পারে।

    গুড় নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন ও তার উত্তর (FAQs)

    ১| রোজ কি গুড় খাওয়া যায়?

    উত্তর: অতি সামান্য পরিমাণে। নাহলে রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যাবে।

    ২| গুড় কি শরীরকে উষ্ণ রাখে?

    উত্তর: হ্যাঁ, এর মধ্যে যা যা উপাদান আছে সেগুলো একত্রে শরীরকে উষ্ণ রাখে।

    ৩| রাত্রে গুড় খাওয়া কি বেশি ভালো?

    উত্তর: সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। আপনি যখন খুশি এটা খেতে পারেন।

    ৪| বেশি গুড় খাওয়া কি খারাপ?

    উত্তর: এতে মধুমেহ দেখা দিতে পারে বা ওজন বেড়ে যেতে পারে।

    ৫| শিশুদের জন্য এটা কতটা ভালো?

    উত্তর: অল্প পরিমাণে দিতে পারেন। তবে বেশি দেবেন না, এতে ওজন বাড়তে পারে বা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

    POPxo এখন ৬টা ভাষায়! ইংরেজি, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মারাঠি আর বাংলাতেও!

    এসে গেল #POPxoEverydayBeauty - POPxo Shop-এর স্কিন, বাথ, বডি এবং হেয়ার প্রোডাক্টস নিয়ে, যা ব্যবহার করা ১০০% সহজ, ব্যবহার করতে মজাও লাগবে আবার উপকারও পাবেন! এই নতুন লঞ্চ সেলিব্রেট করতে প্রি অর্ডারের উপর এখন পাবেন ২৫% ছাড়ও। সুতরাং দেরি না করে শিগগিরই ক্লিক করুন POPxo.com/beautyshop-এ এবার আপনার রোজকার বিউটি রুটিন POP আপ করুন এক ধাক্কায়...।